মোঃ রাসেল সরকার-অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন, ঢাকা:
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত পণ্যের ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও, আড়ালে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ মাদক ও মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্ক। প্রশাসনিক ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যাকআপকে পুঁজি করে কীভাবে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে, তা নিয়ে তৈরি হলো এই বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন।
ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মদের পাইকারি ও খুচরা বিক্রির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে নুরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির নাম। দৃশ্যপটে খুব একটা আলোচিত না হলেও, তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
মদের আমদানি, সংরক্ষণ এবং খুচরা বিক্রি। দেশজুড়ে একাধিক ওয়্যারহাউজ এবং বার এই নেটওয়ার্কের মূল ভিত্তি। ইস্কাটন ও তেজগাঁও এলাকা (ঢাকা), টঙ্গী বা বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা, ফু-ওয়াং (তেজগাঁও ও কক্সবাজার শাখা),বুফে লাউঞ্জ (কুয়াকাটা), আইরিশ ক্লাব (পোস্তগোলা), হলিডে বার (ডেমরা, কোনাবাড়ী), থাই ক্লাব (মিরপুর)। এই বার ও লাউঞ্জগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাক মানি হোয়াইট করার মাধ্যম বা ‘মানি কনভার্সন সেন্টার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জানা যায়। সীমিত লাইসেন্সে আমদানি দেখিয়ে অতিরিক্ত বিক্রি, স্টক ও রেকর্ডের গরমিল এবং ক্যাশ ট্রানজেকশনের মাধ্যমে এই অর্থ ব্যবস্থার বাইরে আবর্তিত হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নজর এড়িয়ে কীভাবে এমন ব্যবসা পরিচালিত হয়, তার পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সুইডেন আসলামের সাথে পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন জোনে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত মাসোহারা ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই অবৈধ সাম্রাজ্যকে আইনি বৈধতার রূপ দেওয়া হয়। স্টক বা চালানের কাগজে গরমিল থাকলেও প্রশাসনিক তদারকির অভাবে তা আড়ালেই থেকে যায়। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলেই সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই সিন্ডিকেট তাদের প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। নুরুল ইসলামের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দুই কন্যার হাতে। এর মধ্যে বড় কন্যা দিশা ইসলামের সাথে জনপ্রিয় ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের বিবাহবন্ধনের পর এই সিন্ডিকেটের মোড় ঘুরে গেছে।
দিশা ইসলামের প্রথম সংসারের দুই সন্তানসহ এই বিয়ে নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বিয়ের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হলো প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার পৈতৃক সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া। সালমান মুক্তাদিরকে কেবল কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ইউটিউবার হিসেবে মনে করা হলেও, এই সম্পর্কের সূত্রে তিনি এখন পরোক্ষভাবে এই বিশাল মাদক সাম্রাজ্য ও লাইসেন্সকৃত ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক বা নেপথ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
অপরাধ ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাশ-হেভি ব্যবসা এবং ভুয়া ইভেন্ট বা অতিরিক্ত বিলিংয়ের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করা আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের হুমকি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত মদ বিক্রি, স্টক রেজিস্টারে গরমিল এবং কর ফাঁকি দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, “যখন কোনো অবৈধ অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সুরক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তোলে, তখন তা কেবল রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতিই করে না, বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। এই ধরনের নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে সুনির্দিষ্ট ফরেনসিক অডিট এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইনগত পদক্ষেপ জরুরি।”
পর্দার আড়ালের এই মাদক সাম্রাজ্য ও মানি লন্ডারিং সিন্ডিকেট দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই বিশাল দুর্নীতির জাল ছিন্ন করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।