অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, মো: রাসেল সরকার;
ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকায় (যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলীর একাংশ) প্রায় হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে অস্ত্রের মহড়া, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ও কৌশলী অবস্থানের কারণে দিন দিন অবনতি হচ্ছে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকার বিভিন্ন পরিবহন ও ফুটপাত থেকে দৈনিক এবং এককালীন বড় অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়। ‘শরীয়তপুর সুপার’ বাস থেকে এককালীন ৬ লাখ ও দৈনিক ১ হাজার টাকা, ‘পদ্মা সুপার’ থেকে এককালীন ৩ লাখ ও দৈনিক ৩ হাজার টাকা, ‘ফেম পরিবহন’ থেকে আড়াই লাখ এবং দৈনিক ২ হাজার টাকা এবং ‘ডিএম পরিবহন’ থেকে দৈনিক ৫ হাজার টাকা চাঁদা নেন তারেক। এছাড়া ‘নড়িয়া সুপার’ থেকে আড়াই লাখ ও দৈনিক ২ হাজার টাকা নেন কাব্য খন্দকার, ‘পদ্মা এসি পরিবহন’ থেকে ২ লাখ ও দৈনিক ২ হাজার টাকা নেন শাকিল মোল্লা এবং ‘সোনালী, সার্বিক ও গোল্ডেন লাইন’ থেকে ৪ লাখ ও দৈনিক ৬ হাজার টাকা চাঁদাবাজি করেন দ্বীন ইসলাম দিনা।
রাজিব ও সাধ পরিবহন থেকে গাড়িপ্রতি দৈনিক ১ হাজার টাকা নেন জাহিদুল ইসলাম অপু ও তারেক। হটলাইন কাউন্টার থেকে দৈনিক ১০ হাজার টাকা তোলেন চান্দি রতন ও অপু। গাড়ি পার্কিংয়ের নামে প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা করে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নেন শ্রমিকদলের খন্দকার রানা ও শাকিল। ডেমরা-যাত্রাবাড়ী লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা তোলেন ‘জামাই রনি’। এছাড়া বাহাদুর শাহ পরিবহন থেকে শিপন, আসমানী ও আলিফ পরিবহন থেকে রফিক, রাজধানী পরিবহন থেকে মাসুদ রানা, অছিম পরিবহন থেকে প্রকাশ ও ফেরদৌস হোসেন রনির মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়।
সিটি করপোরেশন মার্কেট শাকপট্টি থেকে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা নেন বিএনপি নেতা নবী উল্লাহর ভাগ্নে আওলাদ। একই মার্কেট থেকে দৈনিক ২ লাখ টাকা তোলেন নবীউল্লাহর ছোট মেয়ের জামাই রনি। স্টাফ কোয়ার্টার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে রফিক এবং সাইনবোর্ড ফুটপাত থেকে আজিজ, ফারুক আহমেদ সাদু ও রনির মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হয়।
শীতলক্ষ্যা নদীতে হজরত আলী ও রনির মাধ্যমে চাঁদা তোলা হয়। ৬৭নং ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও রনির মাধ্যমে জায়গা-দমি দখল ও চাঁদাবাজি চলছে। ৬৯নং ওয়ার্ডে প্রকাশ ও রনির মাধ্যমে ড্রেজার বসিয়ে মাটি ভরাট ও অবৈধ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ৭০নং ওয়ার্ডে নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা সম্রাটের সহযোগী মোফাজ্জল হোসেন ভুঁইয়ার মাধ্যমে জমিতে মাটি ভরাট ও দখল চলে, পরবর্তীতে আজিজ ও রনির মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬৬নং ওয়ার্ডে হেলাল, ৬৭নং ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও রনি এবং ৬৯নং ওয়ার্ডে প্রকাশ, আল-আমিন ও তোফাজ্জলের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ রয়েছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ীর সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় ২ লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিরোধকে কেন্দ্র করে অটোরিকশা গ্যারেজের মালিক সাগর খান ওরফে ইমরানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতের স্ত্রী থানায় হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা করলে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। গত ২৩ জুলাই ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন বানচাল করতে প্রতিষ্ঠানের সামনে ফাঁকা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। গত ২৮ আগস্ট ভোরে সারুলিয়ায় ডেমরা থানা বিএনপির আহ্বায়ক রেজা চৌধুরী সেলিমের বাড়িতে হেলমেটধারী দুর্বৃত্তরা তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে। মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, আওয়ামী লীগ আমলের মাদক সিন্ডিকেটকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্রদল নেতা মাসুদ এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে।
যাত্রাবাড়ীর সাবেক যুবদল নেতা মুশফিকুর রহমান ফাহিম কাউন্টারে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে উল্টো চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়। গত ৫ আগস্টের পর একজন ছিনতাইকারীকে শাস্তির দেওয়ার পুরোনো ভিডিওকে ভিন্ন রঙ দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে গৃহপালিত পুলিশকে দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা নবী উল্লাহ নবী বলেন, “ঢাকা-৫ আসনের এমপি সংসদে যে চাঁদাবাজির কথা বলেছেন, সেটি নির্দিষ্ট করে আমার নাম বলেননি। সেগুলো বহিরাগত বা আওয়ামী লীগের গুপ্তবাহিনীও হতে পারে। যাত্রাবাড়ীতে কোনো রাজনৈতিক কোন্দল নেই। স্থানীয় জনগণ বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ করায় কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাই ওই ক্ষুব্ধ গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি সব সময় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার।” যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু বলেন, “মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে কেউ মাসোহারা নিচ্ছে— এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। গাড়ি পার্কিংয়ের চাঁদাবাজির বিষয়টি ট্রাফিক বিভাগ দেখছে, তবে যাত্রাবাড়ীতে যানজট মুক্ত রাখতে আমরাও কাজ করছি।”
ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন বলেন, “নবী উল্লাহ নবী কিছুদিন আগে নিজেই স্বীকার করেছেন যে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে এবং তাকেও ভাগ দেওয়া হচ্ছে। সব জায়গা থেকেই চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসছে।” এলাকাবাসীর দাবি, যাত্রাবাড়ীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চলবে.!
বিস্তারিত আসছে ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে।